![]()
পবিত্র ঈদুল আযহাকে ঘিরে দেশের মসলার বাজারে এখন ব্যাপক চাহিদা দেখা দিয়েছে। কোরবানির মাংস রান্না, সংরক্ষণ ও বিতরণকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মসলার বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে।
বিশেষ করে জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, শুকনা মরিচ, ধনিয়া, জয়ফল, জয়ত্রী ও তেজপাতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দাম এবং ভেজাল মসলার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, চকবাজার ও রামপুরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি জিরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, দারুচিনি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং এলাচ ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া শুকনা মরিচের গুঁড়া ৫০০ টাকা, ধনিয়ার গুঁড়া ২০০ থেকে ২৮০ টাকা এবং গোলমরিচ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি ব্যয়, ডলারের উচ্চ মূল্য এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় কিছু মসলার দাম এবার কম রয়েছে। গত বছর জিরার দাম ছিল ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত, যা এবার নেমে এসেছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। একইভাবে কিছু মানের এলাচ ও দারুচিনির দামও তুলনামূলক কমেছে।
অন্যদিকে গোলমরিচের দাম বেড়েছে। গত বছর কালো গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৯৫০ টাকা কেজি দরে, যা এবার বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০ টাকা। তবে সাদা গোলমরিচের দাম কিছুটা কমে ১ হাজার ২২০ টাকায় নেমেছে।
হিলি কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত জিরা, ছোট এলাচ, কাজুবাদাম ও কিসমিসসহ প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জিরা ও ছোট এলাচ আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিক টন।
আমদানিকারকরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে ঈদের সময় মসলার দাম ভোক্তার নাগালের মধ্যেই থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রও জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ এলাচ, দারুচিনি, জিরা, লবঙ্গ, আদা ও রসুন আমদানি হওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি নেই।
তবে পাইকারি বাজারে দাম কম থাকলেও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে ৪ হাজার ২০০ টাকার এলাচ খুচরায় ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ৪০০ টাকার দারুচিনি খুচরায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
ঈদের বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে ভেজাল মসলা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের ও ভেজাল মসলা জব্দ করা হয়েছে। গত এক মাসে কারওয়ান বাজার, চকবাজার ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৮ টন ভেজাল মসলা জব্দ এবং ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানে দেখা গেছে, হলুদের গুঁড়ায় টেক্সটাইল রং ও সিসাযুক্ত ক্রোমেট, মরিচের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া ও কৃত্রিম রং, ধনিয়ার গুঁড়ায় কাঠের গুঁড়া এবং জিরার গুঁড়ায় নিম্নমানের শুকনো খৈল মেশানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পরীক্ষাগারে পাঠানো মসলার নমুনার প্রায় ২৮ শতাংশে ভেজালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি ভেজাল ধরা পড়ে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব ভেজাল মসলায় ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এফ এম হেলালুদ্দিন বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতেই পারছে না যে তারা প্রতিদিন বিষাক্ত রাসায়নিক গ্রহণ করছে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের মসলা ও অস্বাভাবিক কম দামের পণ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান জানিয়েছেন, সরকার ঈদকে সামনে রেখে মসলার বাজারে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজার নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি ভেজালবিরোধী অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত আমদানি, বাজার তদারকি এবং ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলে ঈদের আগের শেষ সময়ে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে। একই সঙ্গে সচেতনভাবে কেনাকাটা ও বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ভোক্তারাও ঝুঁকি কমাতে পারবেন।