![]()
চলতি বছরের মার্চে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার বিষয় নয়; বরং ব্যবসায়িক আস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার দুর্বলতাকেই প্রতিফলিত করছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা পরিচালনার বাড়তি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরেও বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে তা কমতে কমতে মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০০৩ সাল থেকে তথ্য প্রকাশ শুরুর পর সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আংশিক ফিরলেও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদান—যেমন কম ব্যবসায়িক ব্যয়, স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি, কার্যকর লজিস্টিক ব্যবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তা—এখনও নিশ্চিত হয়নি। তার মতে, মার্চের জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ব্যাংকারদের একাংশ মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থানও পরিষ্কার নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো—কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তা ব্যবসায়ীরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছেন না। ফলে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থানে যাচ্ছে।
এদিকে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা কম সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ায় ঋণের চাহিদাও কমেছে। ব্যাংকারদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমিয়ে পরিচালনা করছে। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ও নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগও কমে গেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। প্রায় ঝুঁকিমুক্তভাবে ১১ শতাংশের কাছাকাছি সুদ পাওয়ায় অনেক ব্যাংকের জন্য সরকারি সিকিউরিটিজ এখন প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই বিনিয়োগ আস্থা পুনরুদ্ধার, জ্বালানি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং সুস্পষ্ট আর্থিক নীতির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে সক্রিয় করা এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।