![]()
১৯৯৬ সালের ২০ মে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে এক নাটকীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ওই দিন তৎকালীন সেনাপ্রধান আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম-এর নির্দেশে দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে সশস্ত্র সেনাদল ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। একই সময়ে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস-এর অনুগত সেনা কর্মকর্তারা ঢাকায় প্রবেশ ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেন। এতে দেশে কার্যত এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।
ঘটনার পটভূমি তৈরি হয় দুইজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোকে কেন্দ্র করে। ১৮ মে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে বগুড়ার জিওসি মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ খান এবং তৎকালীন বিডিআরের উপ-মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমানকে অবসরে পাঠানো হয়। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন সেনাপ্রধান নাসিম, কারণ ওই দুই কর্মকর্তা তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন বই ও গবেষণা সূত্র অনুযায়ী, সেনাপ্রধান নাসিম তার বিরোধী অবস্থানে থাকা কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন। একই সময়ে রাষ্ট্রপতির অনুগত ও সেনাপ্রধানের অনুগত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৯৬ সালের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচন বর্জন করেছিল বিরোধী দলগুলো। আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে এবং বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ জুন। ঠিক এই উত্তেজনাপূর্ণ সময়েই সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা দেখা দেয়।
২০ মে সেনাপ্রধান নাসিম দেশের বিভিন্ন ডিভিশনকে ঢাকায় সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন। ময়মনসিংহ, বগুড়া ও যশোর সেনানিবাস থেকে ব্রিগেড পর্যায়ের সেনাদল ঢাকার দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ এবং রেডিও-টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল এ অভিযানের অংশ।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির পক্ষের সেনা কর্মকর্তারা পাল্টা অবস্থান নেন। সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান এবং কুমিল্লার মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকায় সেনা প্রবেশ ঠেকাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শ্রীপুর, আরিচাঘাট, মাওয়া ঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা মোতায়েন করা হয়। বঙ্গভবন, রেডিও ও টেলিভিশন ভবন ঘিরেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
ঢাকার রাস্তায় সেদিন ট্যাঙ্ক চলাচল দেখা যায়। শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ ঘরে আশ্রয় নেয়। যদিও সেনাবাহিনীর দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত কোনো গোলাগুলি বা সংঘর্ষ হয়নি।
এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস সেনাপ্রধান নাসিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মাহবুবুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রপতি টেলিভিশন ভাষণে নাসিমের কর্মকাণ্ডকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে নাসিম দাবি করেছিলেন, তাকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ছিল “অবৈধ” এবং নিয়ম অনুসরণ না করেই তা করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির ঘোষণার পর ধীরে ধীরে নাসিমের সমর্থক কর্মকর্তারা সরে যেতে শুরু করেন এবং তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।
ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। কেউ এটিকে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা বলেছেন, আবার কেউ একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই নাটকীয় ঘটনার মাত্র ২২ দিন পর, ১২ জুন ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ২০ মে’র ঘটনাকে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।