![]()
আব্দুল আজিজ
বাংলাদেশ ই-কমার্স খাত দ্রুত বিস্তৃত হলেও এর ভবিষ্যৎ সফলতা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আধুনিক লজিস্টিক অবকাঠামোর ওপর। প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাণিজ্যের যুগে শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; পণ্য দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা।
বর্তমানে দেশে লাখো উদ্যোক্তা, নারী ব্যবসায়ী, ডেলিভারি কর্মী এবং প্রযুক্তি পেশাজীবী ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো অর্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু ডেলিভারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল ঠিকানার অভাব এবং কাস্টমস জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অ্যাড্রেসিং সিস্টেমের অভাব। অনেক এলাকায় এখনো নির্ভুল লোকেশন তথ্য না থাকায় ডেলিভারিতে দেরি হচ্ছে এবং অপারেশনাল খরচ বাড়ছে। একইসঙ্গে লাস্ট-মাইল ডেলিভারি ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
দেশের ই-কমার্স খাত এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সারাদেশে দ্রুত পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে স্মার্ট ফুলফিলমেন্ট সেন্টার গড়ে না ওঠায় ডেলিভারি সময় দীর্ঘ হচ্ছে। এছাড়া রিটার্ন, রিফান্ড ও এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থাও এখনো পর্যাপ্ত আধুনিক নয়।
বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ অনলাইন অর্ডার ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ নির্ভর। এর ফলে উদ্যোক্তাদের পেমেন্ট পেতে দেরি হয় এবং বাতিল অর্ডারের ঝুঁকি বাড়ে। একইসঙ্গে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ নিতে হয়।
তবে আশার দিকও রয়েছে। বর্তমানে দেশে দ্রুত বিস্তৃত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, শক্তিশালী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ভিত্তি, প্রযুক্তি-দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত পোস্ট অফিস নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ থেকে এখনো বৈশ্বিক পর্যায়ের ‘আমাজন’ বা ‘আলিবাবা’ তৈরি না হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সীমাবদ্ধতা, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতিমালার দুর্বলতা এবং বিশ্বমানের লজিস্টিক ব্যবস্থার অভাব বড় কারণ।
তারা বলছেন, জাতীয় স্মার্ট লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল কাস্টমস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেলিভারি সিস্টেম এবং সমন্বিত কুরিয়ার ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাংলাদেশ দ্রুত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ডিজিটাল বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে।
এছাড়া কৃষিপণ্য, ওষুধ, ডেইরি ও মৎস্যপণ্যের জন্য আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিক গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতি ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, আগামী দশকে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—দেশ কত দ্রুত একটি ‘স্মার্ট লজিস্টিক জাতি’ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে তার ওপর।