![]()
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। একসময় বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং ইউরোপীয় ক্রেতাদের কঠোর পরিবেশগত শর্ত পূরণ করাই এই পরিবর্তনের মূল কারণ।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাহ অ্যাপারেলস চার বছর আগে সৌরবিদ্যুতে ৫৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান জানান, প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে আট বছর লাগবে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই সেই অর্থ উঠে আসছে। বর্তমানে কারখানাটির মোট বিদ্যুতের প্রায় ২৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসে এবং আগামী বছরে শতভাগ বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে শান্তির নীড় সোয়েটার্স লিমিটেড নামের আরেকটি কারখানা সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের পর মাসিক বিদ্যুৎ বিল ৩.৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে প্রায় ১.২১ লাখ টাকায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ম্যাপড-এর জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার মধ্যে ১ হাজার ১০৭টি ইতোমধ্যে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি কারখানার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বিজিএমইএ-এর সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, এখন সৌরবিদ্যুৎ শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্তে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশগত নীতিমালা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানো, ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (DPP) চালু করা এবং সাপ্লাই চেইনে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার মতো শর্ত বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে। ফলে ইউরোপীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সরবরাহকারী কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে উৎসাহিত করছে। এইচঅ্যান্ডএম এবং লিনডেক্স এইচকে লিমিটেড-এর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে কার্যাদেশ কমে যেতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের পথে বড় বাধা হচ্ছে অর্থায়ন ও উচ্চ আমদানি শুল্ক। ব্যাংকগুলো এখনো ছোট উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত গ্রিন ফাইন্যান্সের বড় অংশ পেয়েছে বড় কোম্পানিগুলো, ছোট উদ্যোক্তারা সেই সুবিধা খুব কমই পাচ্ছেন। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতিতে উচ্চ শুল্ক প্রকল্প ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন জামান খান।
এ অবস্থায় সরকার কিছু প্রণোদনার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নামমাত্র আমদানি শুল্ক, পাঁচ বছরের কর অবকাশ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা আনার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। ফলে উদ্যোক্তারা আশা করছেন, নীতিগত সহায়তা বাড়লে দেশের ছোট ও মাঝারি শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।