• হোম > অর্থনীতি > ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, ১ কোটি কর্মসংস্থান: প্রবৃদ্ধির নতুন পথে সরকার

১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, ১ কোটি কর্মসংস্থান: প্রবৃদ্ধির নতুন পথে সরকার

  • সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১০:১৮
  • ৪৯

---

দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে প্রচলিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পরিবর্তে নতুন একটি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণ করেছে বিএনপি সরকার। ‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো: জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১’ শীর্ষক এ রূপরেখায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনাটির চূড়ান্ত অনুমোদন আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নতুন কৌশল অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য ৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের হার জিডিপির বর্তমান ৩১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজস্ব আহরণ ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশে উন্নীত করারও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে স্থিতিশীল রাখার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতনির্ভর বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারি–এর সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিদিন ১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কৌশলগত কাঠামোর উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো নীতিমালাগুলো যেন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়। তার মতে, প্রবৃদ্ধির সংখ্যাগত লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে কার্যকর নীতি বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রস্তুত করা এ রূপরেখা গতকাল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী–এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়।

এই কৌশলকে তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা, দ্বিতীয় ধাপে পুনরুজ্জীবন এবং শেষ ধাপে পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হবে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এমএসএমই খাতকে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ক্ষতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিকল্পনায় চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণসহ ১০টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত করেও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৬৪ জেলায় সৃজনশীল হাব স্থাপন এবং ২ লাখ তরুণকে ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ‘ক্রিয়েটিভ ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের আওতায় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম যেমন Netflix, Amazon ও Disney–এ ১০০টি স্থানীয় চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠান প্রদর্শনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ক্রীড়া উন্নয়নের অংশ হিসেবে একটি জাতীয় অলিম্পিক একাডেমি গঠন, ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ স্থাপন এবং দেশজুড়ে ১ হাজারের বেশি খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

শিক্ষা খাতে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ করে সেখানে আইসিটি, বিজ্ঞান, ভাষা ও কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষিপণ্যের কোল্ড চেইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুর জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।

কৌশলগত নথিতে দেশের দ্রুত ফুরিয়ে আসা জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমতে শুরু করবে। তাই ২০২৬-২০৩০ সময়কালকে ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনর্জিত শ্রম আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে এই আয় ছিল ২ দশমিক ৪১ লাখ কোটি টাকা, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪২ লাখ কোটি টাকায়।

কর্মসংস্থান বাড়াতে তিনটি সম্ভাব্য কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের উন্নতি সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে ডিজিটাল শিক্ষণ পদ্ধতি চালু, কারিগরি শিক্ষার আধুনিকীকরণ এবং বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে চিকিৎসা ব্যয়ে মানুষের নিজস্ব খরচ কমানোর পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের অভাবে ‘মৃত নথি’তে পরিণত হয়েছিল। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে প্রকল্প নির্বাচন, তদারকি, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনমুখী পরিকল্পনা প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/10267 ,   Print Date & Time: Wednesday, 26 August 2026, 09:43:10 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh