• হোম > দেশজুড়ে > শয্যা বাড়ালেও ফেরত দিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে

শয্যা বাড়ালেও ফেরত দিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে

  • সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১০:০৭
  • ৩৪

---

রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট–এর সামনে অ্যাম্বুলেন্সে ছয় মাস বয়সী শিশু নাজনীনকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিলেন তার মা মনোয়ারা বেগম। হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখতে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছিল। ভোলা থেকে মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় ছুটে আসা এই মা জানান, প্রথমে হালকা জ্বর থাকলেও পরে ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। স্থানীয় হাসপাতালে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় পাঠান। তবে হাসপাতালে এসে শয্যা পাবেন কিনা, সেই অনিশ্চয়তাই এখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অতিরিক্ত বেড যুক্ত করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অনেক হাসপাতালে ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ এমনকি বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে। অসংখ্য অভিভাবক সন্তানকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও শয্যা পাচ্ছেন না।

দেশের শিশুদের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট–এ হামে আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত শিশুদের জন্য আগে ১৫টি শয্যা থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ৬০ থেকে ৭০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। এমনকি ডায়রিয়া ওয়ার্ডকেও হাম ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। তবুও প্রতিদিন বহু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুই জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ জটিল উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অনেকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ছে। এতে হাসপাতালের সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালটির ২ নম্বর ওয়ার্ডের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রাকিব জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রোগীর চাপ এখন অনেক বেশি। শয্যা সংকটের কারণে প্রতিদিনই অনেক রোগীকে অন্যত্র যেতে বলা হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮৩ জন। এ পর্যন্ত মোট ভর্তি হয়েছে ৬৬৯ জন শিশু, যার মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ২৯ জন।

পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড কমিউনিটি পেডিয়াট্রিকস বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, গুরুতর অবস্থার অধিকাংশ শিশুই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে। তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকরা ঝুঁকি এড়াতে রোগীদের দ্রুত ঢাকায় রেফার করছেন। ফলে সারা দেশের চাপ এসে পড়ছে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর।

তার মতে, এই সংকট কমাতে জেলা পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ ও বড় হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ এবং উন্নত শিশু চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো জরুরি। প্রতিটি জেলায় অন্তত ১০ থেকে ১৫টি আইসিইউ শয্যা থাকলে ঢাকার ওপর চাপ অনেকটাই কমে যেত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে নতুন করে ২৪৩ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৬৪ শিশু।

গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ৩৮৪ শিশু। একই সময়ে উপসর্গ দেখা গেছে মোট ৫৭ হাজার ৮৪৬ শিশুর মধ্যে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪২ হাজার ৯২ শিশু এবং ৭ হাজার ৭৬৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৭ হাজার ৭৪৪ শিশু।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো গেলে চিকিৎসকদের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে, ফলে ঢাকায় অপ্রয়োজনীয় রেফার কমবে এবং রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও হ্রাস পাবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/10263 ,   Print Date & Time: Wednesday, 26 August 2026, 10:11:45 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh