![]()
অর্থনীতিতে গতি ফেরানো ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী জাতীয় বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত আয় বা ‘কালো টাকা’ বিনিয়োগের সুযোগ পুনর্বহালের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিনিয়োগকারীদের অর্থের উৎস নিয়ে কোনো ধরনের তদন্ত থেকে দায়মুক্তি দিয়ে এই সুবিধা চালুর প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সুবিধা চালু হলে আবাসন খাতে স্থবিরতা কাটবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। তবে কী হারে কর নেওয়া হবে কিংবা সুবিধার কাঠামো কেমন হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আসতে পারে। তবে ট্যাক্স রেট বা ফরম্যাট এখনো নির্ধারিত হয়নি।” আরেক কর্মকর্তা বলেন, “পূর্ণ দায়মুক্তি না দিলে কেউ বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না, কারণ ভবিষ্যতে তদন্তের ঝুঁকি থাকলে মানুষ এগোতে চাইবে না।”
এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর সাম্প্রতিক আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এই সুবিধা পুনর্বহালে অনাগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও এখন বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
সমালোচকদের মতে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পুনর্বহাল করা হলে তা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত সরকারের জন্য এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হবে।” তিনি আরও বলেন, “কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে, বৈষম্য বাড়ায় এবং সংবিধানের চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।”
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলেও সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে, যখন মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে দায়মুক্তির সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করা হয় এবং সরকার প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পায়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধাপে ধাপে এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়।
বর্তমানে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করতে চাইলে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়। তবে দায়মুক্তি না থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশন-সহ অন্যান্য সংস্থা অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
এদিকে সরকার শুধু কালো টাকা বৈধ করার সুযোগই নয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী বিভিন্ন খাতে কর অবকাশ বা ‘ট্যাক্স হলিডে’ সুবিধা পুনর্বহালের বিষয়ও বিবেচনা করছে। কর্মকর্তাদের মতে, ওষুধ, এপিআই, কৃষিযন্ত্র, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সভিত্তিক শিল্পসহ ২০টির বেশি খাত এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, “অর্থনীতিতে গতি আনতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম খাতগুলোকে কর সুবিধা দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।”
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, হঠাৎ করে সুবিধা বাতিল করে আবার হঠাৎ পুনর্বহাল করলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি হবে না। তাদের মতে, কোন খাতকে কর সুবিধা দেওয়া হবে—সে সিদ্ধান্ত গবেষণা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।