![]()
বাংলাদেশ ও ভারত-এর মধ্যকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন চুক্তি বা নবায়ন নিয়ে কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
এদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পক্ষ থেকে নতুন পানি বণ্টন ফর্মুলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, ভারতের নতুন অবস্থান বিদ্যমান চুক্তির নবায়নকে জটিল করে তুলতে পারে।
গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুতে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানিয়েছেন, সরকার এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। তার ভাষায়, দুই দেশের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনার পর যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ভিত্তি ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পানিপ্রবাহের তথ্য। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহের মাত্রা অনুযায়ী দুই দেশ পানি ভাগ করে নেয়।
বর্তমানে ভারতীয় পক্ষের কিছু মহল সাম্প্রতিক কয়েক দশকের গড় পানিপ্রবাহকে ভিত্তি ধরে নতুন ফর্মুলার কথা বলছে। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ সম্প্রতি বলেছেন, ১৯৯৬ সালের পুরোনো ফর্মুলা এখন আর কার্যকর নাও হতে পারে এবং গত ৪০ বছরের পানিপ্রবাহ বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত এ ধরনের প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, গঙ্গা নদীর উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে ফারাক্কায় পানির প্রবাহ কমে গেছে। তাই কেবল ফারাক্কার কম প্রবাহকে ভিত্তি করে গড় হিসাব করলে তা বাংলাদেশের জন্য ন্যায্য হবে না।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশ আগে থেকেই সম্মত হয়েছিল যে পুরো নদীর প্রবাহের ভিত্তিতে পানি ভাগ হবে। তাই নতুন করে একতরফা কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, বাংলাদেশে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে পানিসহ সব দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে আলোচনা করতে ভারত প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে জেআরসি সময়মতো অংশ নেবে।
ঐতিহাসিকভাবে গঙ্গার পানি বণ্টন প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে যে এর ফলে পদ্মা নদীর প্রবাহ কমে গিয়ে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ইস্যু বহুবার আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালে ফারাক্কার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লং মার্চ করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানি প্রত্যাহার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে এবারের আলোচনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই দেশই এখন কূটনৈতিকভাবে “ন্যায্য ও টেকসই” সমাধানের কথা বললেও চূড়ান্ত সমঝোতা কীভাবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।