![]()
রাষ্ট্রায়ত্ত Janata Bank PLC–এর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকায়—যা পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়েরও দ্বিগুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুসারে ব্যাংকটির ১২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার মূলধন সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে উল্টো ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ৫৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
খেলাপি ঋণের চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলেছে ব্যাংকটির আয়-ব্যয়ে। ২০২৫ সালে শুধু সুদ খাতেই জনতা ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে ৩ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা আয় করলেও বছর শেষে ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। এর আগের বছরেও ব্যাংকটি ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল। অর্থাৎ টানা দুই বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার নিট লোকসান গুনেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ ব্যাংকটি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকটির বর্তমান সংকটের সূচনা ২০০৯ সালের পর থেকে। ওই সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদ গঠন, ঋণ বিতরণ, পদোন্নতি ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। ব্যাংকটির বড় বড় করপোরেট ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ এখন খেলাপি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত জামানত নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠী নিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে Beximco Group—২৪ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এছাড়া S Alam Group নিয়েছে ১১ হাজার ৬৫ কোটি, Ananta Group–সংশ্লিষ্ট এননটেক্স ৮ হাজার ৭৪ কোটি, Crescent Group ৪ হাজার ১৪ কোটি এবং Orion Group নিয়েছে ২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেক্সিমকো, এস আলম, এননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রায় পুরো ঋণই বর্তমানে খেলাপি।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বলেছেন, ঋণের ৭০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেলে কোনো ব্যাংকের পক্ষে মুনাফা করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মীদের মাসিক প্রায় ১২৫ কোটি টাকার বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মতে, বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপের ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে কার্যকর সমাধান হলে ব্যাংকটি পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, জনতা ব্যাংকের পরিস্থিতি এতটাই গভীর যে সরকারি মূলধন জোগান দিয়েও এটিকে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন হবে। BASIC Bank Limited ও Padma Bank PLC–এর উদাহরণ টেনে তারা বলছেন, অতীতে সরকারি সহায়তা দিয়েও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়নি। অর্থনীতিবিদ Fahmida Khatun মনে করেন, জনগণের করের অর্থ থেকে আবারও বড় অঙ্কের মূলধন সহায়তা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়; বরং খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে হবে।