• হোম > অর্থনীতি > ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪৪% বেড়ে রেকর্ড ৯৪,০০০ কোটি টাকা

ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪৪% বেড়ে রেকর্ড ৯৪,০০০ কোটি টাকা

  • মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ১১:৩৫
  • ৬২

---

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ PLC-এর সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন এক আর্থিক বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণ বা বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর ৫১ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো একক ব্যাংকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ১৭ শতাংশই এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের। তুলনামূলকভাবে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা জনতা ব্যাংক PLC-এর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭২ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই বিপুল খেলাপি ঋণের মূল কারণ এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট গোপন ঋণ। অভিযোগ রয়েছে, আগের ব্যবস্থাপনা পরিকল্পিতভাবে এসব ঋণের প্রকৃত তথ্য গোপন করেছিল। বর্তমান ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরীক্ষায় প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পায়।

২০২৫ সালের অডিট রিপোর্ট তৈরি করেছে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কো.। নিরীক্ষকরা ব্যাংকটির ওপর “কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন” দিয়েছেন এবং আর্থিক সুরক্ষায় বড় ধরনের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখার কথা ছিল, কিন্তু রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার বিশাল সঞ্চিতি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, এই ঘাটতি আর্থিক বিবরণীতে সমন্বয় করা হলে ব্যাংকের সম্পদ, মুনাফা ও মূলধনের প্রকৃত অবস্থা আরও খারাপভাবে প্রকাশ পেত।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত ছাড় ছাড়া ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ টিকে থাকা বা “গোয়িং কনসার্ন” সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

মূলধনের অবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকটির ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূলধন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রিপোর্টকৃত মূলধন মাত্র ৯ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। দৃশ্যমান মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা হলেও, নিরীক্ষকদের মতে প্রকৃত প্রভিশন ঘাটতি বিবেচনায় নিলে রেগুলেটরি মূলধন ঘাটতি প্রায় ৯৩ হাজার ৯৬০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (CRAR) মাত্র ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড় না থাকলে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি এককভাবে প্রায় ৮৪ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা লোকসানে পড়ত।

প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপ-এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণের তথ্যও উঠে এসেছে। এর মধ্যে:

  • এস আলম স্টিলস ও রিফাইনড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের ঋণ: ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা
  • এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ঋণ: ১৪ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা
  • এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের ঋণ: ১২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা

ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

এত বড় সংকটের মধ্যেও গত ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার প্রভিশন সমন্বয় ছাড়াই আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। বিনিময়ে আগামী এক মাসের মধ্যে ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে।

ব্যাংকটির আর্থিক পারফরম্যান্স তলানিতে পৌঁছানো এবং টানা দ্বিতীয় বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পুঁজিবাজারে একে ‘জেড’ বা জাঙ্ক ক্যাটাগরিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। যদিও ব্যাংকটি ১৩৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে, বিশ্লেষকদের মতে সেটিও মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ছাড়ের ফল। বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ারদর ফ্লোর প্রাইস ৩২ দশমিক ৬০ টাকায় স্থির রয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/10042 ,   Print Date & Time: Saturday, 10 October 2026, 10:58:04 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh